অনিয়মের অভিযোগের মুখে ডব্লিউএইচও থেকে শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদের পদত্যাগ: রয়টার্স

Published
পড়ার সময়: ৬ মিনিট

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক প্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল।

ডব্লিউএইচও'র মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুসের কাছে বুধবার পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি। বার্তা সংস্থা রয়টার্স এই খবর প্রকাশ করেছে।

তবে তার এই পদত্যাগ গ্রহণ করা হয়েছে কি না সে বিষয়ে এখনো কিছু জানায়নি জাতিসংঘের এই সংস্থাটি।

এই সংস্থার ওয়েবসাইটে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক প্রধান হিসেবে এখনো তার নাম, ছবি এবং আগের নিয়োগের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিটি রয়েছে।

তবে রয়টার্স বলছে, অবিলম্বে এই পদত্যাগপত্র কার্যকর হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বাংলাদেশের একটি কর্তৃপক্ষের কাছে তার বিরুদ্ধে আনা অনিয়ম-জালিয়াতির অভিযোগের তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায়ই পদত্যাগ করেন তিনি।

ডব্লিউএইচও সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে "চীনে তার সফরসংক্রান্ত বিষয়ে আর্থিক জালিয়াতি করার" এবং তার একাডেমিক যোগ্যতা সম্পর্কে ভ্রান্ত তথ্য দেওয়ার অভিযোগ আনে। ২০২৬ সালের তেসরা জুলাই ডব্লিউএইচওকে পাঠানো তার আইনজীবীদের একটি পৃথক চিঠিতে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে, যেটি রয়টার্স দেখেছে।

সায়মা ওয়াজেদ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

একইসঙ্গে, বুধবারের পদত্যাগপত্রে সায়মা ওয়াজেদ উল্লেখ করেছেন, তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে একটি প্লট অবৈধভাবে অধিগ্রহণের অভিযোগ এনেছে ডব্লিউএইচও।

সায়মা ওয়াজেদ জানিয়েছেন, জাতিসংঘের এই সংস্থাটিতে যোগদানের আগেই এই জমিটি অধিগ্রহণ করেছিলেন তিনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য একটি আইনের আওতায় ওই জমিটি তিনি পেয়েছিলেন।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর কেবল তার মন্ত্রিসভার সদস্য, রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরাই নয় বরং তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেও অনিয়ম, দুর্নীতিসহ নানা অপরাধের অভিযোগ উঠেছে। কিছু মামলার রায়ও হয়েছে।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই শেখ হাসিনা এবং তার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ জয় ভারতের দিল্লিতে অবস্থান করছেন।

এই মুহূর্তে সায়মা ওয়াজেদ দিল্লিতে রয়েছেন বলে জানতে পেরেছে বিবিসি। গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে গত আড়াই বছর ধরে দিল্লিতেই তার বাসস্থান। তবে প্রয়োজনে অন্যান্য দেশেও যাতায়াত করছেন তিনি।

পদত্যাগপত্রে যা বলেছেন সায়মা ওয়াজেদ

পাঁচ বছরের জন্য ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘের এই সংস্থাটির আঞ্চলিক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন সায়মা ওয়াজেদ। ২০২৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ওই পদের মেয়াদ ছিল।

তবে, দুর্নীতি, জালিয়াতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ এনে তার বিরুদ্ধে গত বছরের শুরুর দিকে বাংলাদেশে দুর্নীতি দমন কমিশন মামলা দায়ের করলে জুলাইতে তাকে অবৈতনিক ছুটিতে পাঠায় জাতিসংঘের এই সংস্থা, ডব্লিউএইচও।

রয়টার্স জানিয়েছে, বুধবার জমা দেওয়া পদত্যাগপত্রে সায়মা ওয়াজেদ লিখেছেন, "আমার অঞ্চলের দেশগুলোর সেবা করার জন্য আমি আঞ্চলিক পরিচালক পদে নির্বাচিত হয়েছিলাম এবং সেটি সততার সঙ্গেই পালন করেছিলাম।"

"যেহেতু আপনি আমাকে আমার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা থেকে বিরত রেখে চলেছেন তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় আপনার নেতৃত্বের ওপর আমার আস্থা এবং বিশ্বাস হারিয়ে গেছে," লিখেছেন মিজ ওয়াজেদ।

তিনি আরো লিখেছেন, "আপনার সিদ্ধান্তে আমাকে অবৈতনিক ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্তের পর এক বছর ধরে কোনো বেতন বা পারিশ্রমিক না পাওয়ায় আমার আর্থিক অবস্থা অসহনীয় হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে, আমি সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।"

এর আগে, জুলাইতে এক চিঠিতে সায়মা ওয়াজেদ আইনজীবীর মাধ্যমে চীন সফরে জালিয়াতির অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন।

সেসময় তিনি জানিয়েছিলেন, ওই ভুল প্রশাসনিক একজন কর্মকর্তা করেছিলেন। যিনি দৈনন্দিন বিল পরিশোধের আবেদনগুলো নিয়ে কাজ করতেন। ওই অর্থের পরিমাণ ছিল ৯০১ ডলার।

একইসঙ্গে, নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বাংলাদেশে অটিজম নিয়ে কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ একটি সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করার কথা ডব্লিউএইচও'র মহাপরিচালককে জানিয়েছিলেন।

জানুয়ারিতে আঞ্চলিক প্রধানের এই পদে নির্বাচন

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক দুইটি সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, জাতিসংঘের এই সংস্থাটি আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে অপসারণের পরিকল্পনা করেছিল।

তাদের একজনের বরাত দিয়ে এই বার্তা সংস্থাটি জানিয়েছে, আগামী বছরের জানুয়ারিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই পদে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে।

আগামী ১২ই অক্টোবর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক প্রধানের এই পদের জন্য মনোনয়নপত্র আহ্বান করা হবে।

জমা পড়া আবেদনগুলো এ বছরের ডিসেম্বরে যাচাই-বাছাই করে আগামী ২৪শে জানুয়ারি ডব্লিউএইচও'র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক প্রধান পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

এই সংস্থাটির আঞ্চলিক পরিচালকরা বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী স্বাস্থ্য নীতি নির্ধারক হিসেবে বিবেচিত হন বলে এই পদটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

আঞ্চলিক পরিচালক ১১টি দেশের দুইশ কোটি মানুষের জন্য ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বাজেট দেখাশোনা করেন।

এই ১১টি দেশ হচ্ছে, বাংলাদেশ, ভুটান, নেপাল, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, উত্তর কোরিয়া, পূর্ব তিমোর।

রোগের প্রাদুর্ভাব ও জরুরি পরিস্থিতিতে সাড়া দেওয়া এবং স্থানীয় পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডব্লিউএইচও'র নীতি বাস্তবায়ন এই আঞ্চলিক পরিচালকদের অন্যতম দায়িত্বে।

প্রতি পাঁচ বছর পর পর সদস্য রাষ্ট্রগুলো আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচন করে থাকে।

সায়মা ওয়াজেদের আঞ্চলিক প্রধানের পদ নিয়ে বিতর্ক কেন?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক পরিচালক পদের জন্য বাংলাদেশের তরফ থেকে যখন সায়মা ওয়াজেদকে মনোনীত করা হয় তখন সেটি নিয়ে বেশ বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।

এই পদের জন্য তিনি কতটা 'উপযুক্ত' সে প্রশ্ন উঠেছিল বিভিন্ন জায়গায়।

চিকিৎসা বিষয়ক বিশ্বখ্যাত সাময়িকী দ্য ল্যানসেট ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে এক সম্পাদকীয়তে সায়মা ওয়াজেদের মনোনয়ন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এতে বলা হয়েছিল, কয়েকটি অঞ্চলে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে; এছাড়া প্রার্থীরা এই পদের জন্য উপযুক্ত কি না সেই প্রশ্নও রয়েছে।

ওই সম্পাদকীয়তে আরো বলা হয় যে, এর ফলে নির্বাচন প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ যেমন রয়েছে তেমনি আঞ্চলিক পরিচালকদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক পদে বাংলাদেশ যে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে সেখানে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তোলা হয়েছে। কারণ প্রার্থী ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে।

এই পদের জন্য সেসময় সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের সাথে আরেকজন প্রার্থী ছিলেন নেপালের সম্ভু আচার্য।

মি. আচার্য ছিলেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, যিনি ৩০ বছর যাবৎ সেখানে কাজ করছিলেন এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর তার পিএইচডি ডিগ্রি রয়েছে।

অন্যদিকে, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে কাজ করতেন। তার বেশিরভাগ কাজ ছিল অটিজম নিয়ে।

ব্রিটেনের ফাইনান্সিয়াল টাইমস পত্রিকার ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এক প্রতিবেদনে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের মনোনয়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। এই পদের জন্য সায়মা ওয়াজেদ কতটা উপযুক্ত সেই প্রশ্ন তোলা হয়েছিল ওই প্রতিবেদনে।

এই প্রতিবেদনে বলা হয়, সায়মা ওয়াজেদ স্কুল সাইকোলিজস্ট হিসেবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং তিনি একটি দাতব্য ও গবেষণা সংস্থা দেখাশোনা করেন। তবে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় বড় বাজেট নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার নেই।

সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে যত মামলা

ক্ষমতার অপব্যবহার করে পূর্বাচলে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্লট বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগের এক মামলায় বাংলাদেশের আদালতে ইতোমধ্যেই পাঁচ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন সায়মা ওয়াজেদ।

গত বছরের এপ্রিলে পূর্বাচল নিউ টাউন প্রকল্পে প্লট বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করার আদেশও দিয়েছিল আদালত।

তবে শুধু তিনিই নন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পরে হওয়া প্লট বরাদ্দে দুর্নীতির এসব মামলায় তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ভাই সজীব ওয়াজেদ জয়, খালা শেখ রেহানা এবং তার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিকেরও নানা মেয়াদে কারাদণ্ড হয়েছে।

এছাড়াও গত বছরের এপ্রিলে দুর্নীতির অভিযোগে সায়মা ওয়াজেদের নামে গুলশানে থাকা একটি ফ্ল্যাট জব্দ করার আদেশ দিয়েছিল আদালত।

ফ্ল্যাটটি দেখাশোনার জন্য একজন রিসিভার নিয়োগের জন্য দুদকের করা আবেদনে ওই আদেশ দিয়েছিল ঢাকার একটি বিচারিক আদালত।

একইসঙ্গে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়ের ঘটনায়ও তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে।

ওইসময় যাত্রাবাড়িতে সংঘর্ষ চলাকালীন ফরিদ শেখ নামে একজন নিহত হওয়ার ঘটনায় তার পরিবার সায়মা ওয়াজেদ এবং তার পরিবারের সদস্যদের আসামি করে ২০২৪ সালের ২০শে অগাস্ট হত্যা মামলা দায়ের করেছিল।

চব্বিশের আটই অগাস্ট সায়মা ওয়াজেদ পুতুল নিজের এক্স হ্যান্ডেলে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন যে, কঠিন পরিস্থিতিতেও মাকে দেখতে পারছিলেন না।

ওই পোস্ট থেকে সেসময় বোঝা গিয়েছিল, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেওয়ার পর থেকে মা ও মেয়ের মধ্যে তখনও দেখাই হয়নি।

সোমবার পাঁচই অগাস্ট যখন নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করে হেলিকপ্টারে দেশ ছাড়তে হয়, তখন সায়মা ওয়াজেদ থাইল্যান্ডে ছিলেন।

তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালকের প্রধান কার্যালয় দিল্লিতে এবং সেই সুবাদে তিনি ওই সময় বেশিরভাগ সময় দিল্লিতেই থাকতেন।